আরেকটা কলকাতা (Village Kolkata)



ঝুপসি জঙ্গল নীলপুকুরের চারপাশ ঘিরে। পুকুরের উত্তরে পুরোনো নীলকুঠির ভাঙ্গা ভিত, নীল কাচার সারি সারি চৌবাচ্চা বুনো ঝোপে ঢেকে রয়েছে। দুশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু ভিতের গাঁথনি এতটুকু টসকায় নি। শাবলের চাড় মেরেও একটা গোটা ইঁট এখনও খুলে আনা যায় না। শঙ্কর চুনুরি চেষ্টা করে দেখেছে। ইঁট ভেঙ্গে যাবে তাও জোড় খুলব না। আজকালকার ফঙ্গবেনে সিমেণ্টের কাজ নয় তো, সুরকি আর শামুক-পোড়া জোংড়া চুনে  (lime) গাঁথা। অমন আর এখন হয় না।

নীলকুঠির উত্তরে, একটুকখানি জায়গা ছেড়ে সেকালের ইউনিয়ন বোর্ডের তৈরি রাস্তা। হো-ও-ও-ই উঁচু, দু মানুষ তো হবেই। তার ওপরে পিচ-পাথরে রোলার টানা হয়েছে তাও বেশ ক বছর আগে। এখন বাঁধের মাথা বরাবর কালো সরু পথ টানা চলে গেছে দেখা যায়। পুবদিকে খানিকটা গিয়েই রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে দক্ষিণে।

নীলপুকুরের দক্ষিণে অল্প একটু ডাঙ্গা জমি পার হলেই নদী। নদী নয় আসলে, নদ। দামোদর (Damodar) নদ। এই কাত্তিক মাসে ছিপছিপে তার চেহারা দেখলে ভাবতেই পারবে না দুমাস আগেই কি চেহারা ধরেছিল বাবা দামোদর। মাঠঘাট ভাসিয়ে নাবো জমির ঘর ডুবিয়ে কিছু আর বাকি রাখেনি। তবে দামোদরকে তো আর আজকে নতুন চেনে না এখানকার লোকেরা, তার লীলাখেলা দেখার অভ্যেস তাদের আছে। এখন তাই রোদ-গড়ানো ঘাটে ঝাপুস ঝুপুস সাঁতার কাটা আর নৌকো বাওয়া। ডিঙ্গি নৌকোয় চড়ে বসে জলে দাঁড়ের দু ঘা মেরে ছোট্ট ছেলে নিমেষের মধ্যে একবার এপাড়ে আসে তো আর একবার ওপাড়ে যায়। ডুব সাঁতার দিয়ে আরেকজন ভুস করে মুণ্ডুটা ভাসিয়ে তোলে ডিঙ্গির পাশটিতে, হাত দিয়ে টেনে ধরে দুলিয়ে দেয় নৌকো।

কুঠির গা ঘেঁষে চুনুরিপাড়া। তার কথাও বলব।

 

********


চুন যে কত রকমের হয় তার ঠিক নেই। আজকাল শামুক-ঝিনুক পোড়ানো চুন বড় একটা হয় না। তৈরি করতে গেলে অনেক হ্যাপা, খরচও অনেক। তার বদলে আছে পাথুরে চুন। এখন তো কেউ আর চুন-সুরকির ঘর বানায় না। কম-পয়সাওয়ালা মানুষ দেওয়ালে চুনকাম করে, আর পকেট যদি একটু ভারী হয় তাহলে কত কোম্পানীর কত রং বাজার ছয়লাপ করে রেখেছে। আর লাগে পানে কি খৈনিতে খাওয়ার চুন। ওষুধ কোম্পানিগুলোরও লাগে কি?

তার চেয়ে বলা ভাল, চুন যে কত রকমের হত এই বাংলাদেশে তার ঠিক নেই। এক তো এই শামুক গুগলি-পোড়া জোংড়া চুন। দারুন জোরদার। সুরকীর সঙ্গে সেই চুন মিলিয়ে ঘর বানালে, চুন-বালির পলেস্তারা দিলে সে ঘর টিকে যাবে বছরের পর বছর। লোনা লাগবে না। পাথুরে চুনের গাঁথনি দিয়ে কিন্তু দেখা গেছে অতটা টেকসই হচ্ছে না ঘর। জল টানছে চুনে, দেওয়াল ফুলে যাচ্ছে, ইঁট খারাপ হচ্ছে। সে জন্য যাদের সামর্থ্য ছিল বেশি দাম দিয়ে হলেও জোংড়া চুনেই ঘর বানাত।

সেকালে অনেক সময় দেখা গেছে বড় বাড়ি কি মন্দির তৈরিতে গাঁথনির কাজে ব্যবহার হয়েছে শুধু নরম কাদামাটি। বাকি কাজ জোংড়া চুনের মশলা দিয়ে হয়েছে। ভেঙ্গে পড়া পুরোনো মন্দিরের ফাটল থেকে বের করা মশলায় শামুকের খোলের টুকরো দেখা গেছে। হয়ত পোড়েনি ভাল করে, কিম্বা হয়ত পোড়ানো চুন ভাল করে চালুনিতে চালা হয়নি।





বেড়াচাঁপায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামের পণ্ডিতেরা যখন খনা মিহিরের ঢিবির নিচ থেকে দেড় হাজার বছরের পুরোনো মন্দিরের ভগ্নাবশেষ খুঁড়ে বের করছিলেন তখন মন্দির চত্বরের কাছেই মাটির নিচে আবিষ্কৃত হয় দুখানি গোল স্তূপ। স্তূপদুটোর ভেতরে দেখা যায় প্রচুর শামুকের খোলা আর কিছু পোড়ানো চুন। মন্দির তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ওই জোংড়া চুন।

আরও একটা কাজে চুনের ব্যবহার ছিল গৌড়বঙ্গে। গুড় তৈরি করতেন যাঁরা, তাঁদেরও কাজে লাগত চুন। তাল বা খেজুর গাছ থেকে রস বের করার সময় সে রস যাতে খারাপ না হয়ে যায় সেজন্য হাঁড়ির ভেতরে চুনের প্রলেপ লাগানো হত। শামুক-পোড়ানো চুনের দাম একটু বেশি হলেও, গুড় ব্যবসায়ীরা সেই চুনই পছন্দ করতেন। এই চুন অল্প একটু ব্যবহার করলেই নাকি কাজ হয়ে যেত। পাথুরে চুন লাগত পরিমাণে অনেক বেশি।

তাছাড়া কবরেজমশাইরাও জোংড়া চুন ভেজানো পরিশ্রুত জল খাওয়ার বিধান দিতেন পেটের নানা রোগে।


পানেও খাওয়া হত এই চুনই। কিন্তু নিষ্ঠাবতী হিন্দু বিধবারা নাকি শামুক-পোড়ানো চুনের পান খেতেন না। তাঁরা খেতেন শঙ্খচুন। সামুদ্রিক শাঁখ পুড়িয়ে তৈরি করা। শাঁখারিদের কাছ থেকে শাঁখের ছাঁট নিয়ে গিয়ে চুনুরিরা শঙ্খচুন বানাত।

আর ছিল পঙ্খের কাজ। গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু বাংলার বাস্তু অলংকরণ শিল্পের লুপ্তধারা প্রবন্ধে লিখেছিলেন, পঙ্খের কাজ হল — বাড়ির দেওয়ালের বালি কাজের উপর একটা বিশেষ ধরণের আবরণ বা একপ্রকার চুনের প্রলেপ লাগানো, অনেকটা কলাই করার মত।... পঙ্খের কাজের জন্য যে বিশেষ রকমের চুন একান্ত প্রয়োজন তা পাওয়া যায় জোঙ্গড়া নামক এক প্রকার শামুক জাতীয় জলজ জীবের আবরণ বা খোলা পুড়িয়ে। সেকারণ এর নাম জোঙ্গড়ার চুন।... প্রসঙ্গত একটা কথা বলা প্রয়োজন, পঙ্খের কাজ করা স্থানের উপর চুনকাম করলে তার উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। পঙ্খের কাজ শুধু ইমারতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না — লোনা ও আর্দ্রতা প্রতিরোধ করে, অবশ্য সেটা জোঙ্গড়া চুনের গুণে।

ও হরি! আমার ধারণা ছিল পঙ্খের কাজ হত শুদ্ধমাত্র শঙ্খের চুনে।

যাগ্গে যাক। শেষ পর্যন্ত কিন্তু দামের প্রতিযোগিতায় জিতে গেল পাথুরে চুন। দক্ষিণবাংলায় তো সে চুন তৈরি হয় না, নিয়ে আসতে হত সিলেট কি বিসরা কি কাটনি থেকে। রেললাইন বসার পর সহজ হয়ে গেল তার যোগান। আর চুনুরিদের কপাল পুড়ল।

এই দেখো, শিবের গীত গাইতে বসে ধান ভানতে শুরু করেছি। ঢেঁকির আর রেহাই নেই। দম-দেওয়া কলের মত চলে। থামতেই চায় না কিছুতে।


তাহলে শোনো, জায়গার নামটা বলি আগে। নদীর পাড়ের ছোট্ট এই গাঁয়ের নাম কলকাতা। একশো দুশ তিনশ বচ্ছর আগেকার নয়গো, আজকের কলকাতা। একই নামে শহর আবার একই নামে গাঁ। বেশ পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা গেরাম। ওপর ওপর ভারী শান্ত পল্লীজীবন। বাঁধের মত উঁচু পথটুকু চলে গেছে নিজের মনে। তার এপারে পুকুর ওপারে পুকুর, চাষের জমি কিন্তু বিশেষ নজরে আসে না। যেটুক আছে তারও বেশিরভাগ ধানই বাবা দামোদরের সেবায় লেগেছে এই বর্ষায়।




লোকে আদর করে ডাকে ছোট কলকাতা। কোথায় যাও গো? বলি কলকেতা যাই। কোন কলকেতা? ছোটো কলকেতা গো, ছোট কলকেতা। আমাদের আবার শহরে কি কাজ? সেটেলমেণ্টের কাগজে গাঁয়ের নাম কিন্তু কলিকাতা। দলিল দস্তাবেজেও তাই। দুশো বছরেরও বেশি পুরোনো মন্দিরের গায়ে সে নামই লেখা। দোকান-টোকানের সাইনবোর্ডে বেশিরভাগ জায়গাতেই লেখা কলিকাতা। অবশ্য দোকানের বালাই খুব একটা নেই ছোট্ট গ্রামে। সাকুল্যে বোধ হয় গুটি ছয়েক। একই জায়গায় চাল ডাল আলু বাতাসাও বিক্কিরি হচ্ছে, আবার কাগজটা কলমটাও পাওয়া যাচ্ছে। বিড়ি সিগারেটও। এক দোকানের গায়ে আবার বড় বড় করে লাল রঙে লেখা কলিকাতার দরে মুদী ও স্টেশনারি দ্রব্য বিক্রয় হয়। ভাব কাণ্ড! কলিকাতার দোকান তো কলিকাতার দরেই দ্রব্যাদি বিক্রয় করবে, নাকি? বেলা খুব একটা হয়নি, কিন্তু বাজার ভোঁ ভাঁ। জিগ্যেস করে জানা গেল বাজার বসে সকাল ছটায়, থাকে সকাল আটটা পর্যন্ত। এ কেমন বাজার গো? কোনোকালে যে সেখানে বাজার বসে দেখে মনেই হবে না, এমনি সাফ সুতরো জায়গাটা। একটা চালা কি ফেলে-যাওয়া ডালা, কিচ্ছুটি নেই কোত্থাও।

কুঠির পেছনে নীলপুকুর, তার কথা বলেছি শুরুতেই। আসলে নীলের কাজের জন্য জলের প্রয়োজন হত প্রচুর। তাই পুকুর কাটানো। তাই এর নাম নীলপুকুর। কারও কারও ধারণা এ কলকাতার নীলকুঠি সাহেবদের তৈরি। সে ধারণটি ঠিক নয়। সাহেব যদি হয়েও থাকে -- তার কোনো প্রমাণ নেই আমার হাতে -- তা হলেও তারা নিয্যস দিশি সাহেব। হুগলি জেলার জনাইয়ের জমিদার ছিল তারা। মুখুজ্যে পরিবার। আজ থেকে ১৮৫ বছর আগে নাকি ওই কুঠির পত্তন।

কুঠির এক কোনা বরাবর তিনঘর চুনুরির বাস। দেখতে যাই। পরিষ্কার নিকোনো উঠোন, একপাশে তুলসী গাছ, বাঁশে বাঁধা তারে শাড়িটা গামছাটা ঝুলছে। মাটির বারান্দায় খেজুর চাটাইয়ের আসন। কিন্তু দাদা তো ঘরে নেই, চুনের কাজের বিষয়ে কথা বলার মত মানুষ আর কেউ নেই এখানে। পাশের ঘরে উঁচু দাওয়ায় হাঁড়ি-কুড়িতে রান্না চড়েছে। বগ্‌বগ্‌ আওয়াজ উঠছে। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ আসছে হাঁড়ি থেকে। গলা বাড়িয়ে গিন্নি জিগ্যেস করেন কোত্থেকে আসা হচ্ছে? কারও সঙ্গে দরকার, নাকি? কত্তার মুখও উঁকি মারে চালের নিচ থেকে। ও, চুনের ব্যাপারে জানতে চান? সে আমরা কিছু জানিনি। দাদা বলতে পারবে হয়ত সে বিত্তান্ত। দেখুন এদিকে ওদিকে আছে কোথাও।

******

শহর কলকাতার নামের উৎস নিয়ে চর্চা হয়েছে অনেক। সম্ভব অসম্ভব নানা তত্ত্ব নানা পণ্ডিত দিয়েছেন। সে সব তত্ত্বের কথা সবাই জানেন। যুক্তি তর্কের শেষ নেই, তবু কেমন মনে হয় সব কটা তত্ত্বই অসম্ভব হওয়া অসম্ভব নয়। এই নাম গবেষণার সূত্র ধরেই ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে ভাষাচার্য সুনীতিকুমার আরেকটা কলকাতার খোঁজ শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সুতানুটির পড়শী গাঁ কলকাতার নামটির উদ্ভব হয়েছে চার-পাঁচশ বছর আগে এবং নামটির সঙ্গে কলিচুনের ব্যবসার কিছু যোগাযোগ আছে। শামুকের খোলা (কাতা) পুড়িয়ে তৈরি করা চুন (কলি)-এর ব্যবসা ছিল এই গাঁয়ে। চাটুজ্যে মশাই খুঁজতে শুরু করেন, আর কোনো কলকাতা কি আছে বাংলাদেশে? সেখানেও কি কোনোকালে শামুক পুড়িয়ে চুন তৈরি হত? সেই মিলের সুতো ধরে কি পাওয়া যেতে পারে নামের উৎস?

সে সময় সুনীতিবাবুর ছাত্র কৃষ্ণপদ গোস্বামী মশাই গ্রামনাম বিষয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি দুটি গ্রামের কথা ভাষাচার্যকে জানান। দুটিরই নাম কলিকাতা। একটি পুব বাংলায়, আরেকটি পশ্চিম বাংলায়। একটি ঢাকা জেলার লোহাজং থানায়, অন্যটি হাওড়া জেলার আমতা থানায়। ১৯৩৭ সালের মে মাসে দুই থানার দুই দারোগাকে চিঠি লিখে গ্রামদুটির বিষয়ে জানতে চান সুনীতিবাবু। লোহাজং থানার ওসি কে মুখার্জি জানালেন, তাঁর থানা আপিসের তিন মাইল উত্তরে কলিকাতা-ভোগদিয়া নামে একটি গ্রাম আছে বটে। সে গ্রামের লোক সংখ্যা সাকুল্যে চারশর বেশি হবে না, এবং তাদের প্রায় সকলেই মুসলমান চাষী। চুন-টুন তৈরি হয় না সেখানে। গাঁয়ের কেউ কোনোকালে চুনের ব্যবসা করেছে বলেও শোনা যায়নি।

আমতা থানা থেকেও উত্তর এল। সাব-ইন্সপেক্টর ও বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন থানা থেকে বায়ুকোণে আড়াই মাইল মত দূরে একটি গ্রাম আছে, যার নাম রসপুর-কলিকাতা। দামোদর নদের উত্তর তীরে সেই গ্রাম। লোকসংখ্যা হাজারখানেক। বেশিরভাগই চাষীবাসী মানুষ। শামুক পুড়িয়ে চুন সেখানে তৈরি হয়। বেশ ভালমতই হয়। তিনটি চুনুরি পরিবারের কথাও বাঁড়ুজ্জেমশাই লিখেছিলেন তাঁর চিঠিতে।

সুনীতিবাবুর বক্তব্য ছিল, চুন শিল্পের সূত্রেই এ জায়গার নাম হয়েছিল কলিকাতা। এবং সুতানুটী-কলিকাতার ক্ষেত্রেও সে সূত্র প্রযোজ্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত চুন ব্যবসার রমরমা ছিল আজকের শহর কলিকাতায়। সে গাঁয়ের (বা উঠতি শহরের) পুব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে বৈঠকখানা স্ট্রীট — এলাকার প্রধান রাস্তা। তার আশেপাশের কয়েকটি অঞ্চল এবং পথের নামের মধ্যে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে চুন শিল্পের স্মৃতি। বৌবাজার স্ট্রীটের উত্তরে চুনাগলি একসময় ছিল কালা ফিরিঙ্গিদের আড্ডা। তারপর চিত্তরঞ্জন অ্যাভেন্যু যেখানে বৌবাজার স্ট্রীটকে কেটে চলে গেছে, সে চৌমাথার উত্তরে, চিৎপুর আর ছাতাওয়ালা গলির পুবে এবং কলেজ স্ট্রীটের পশ্চিমে যে এলাকা, সেখানে ছিল চুনারিটোলা। পুরোনো ম্যাপে আর কাগজপত্রে এখনো তার হদিশ পাওয়া যায়। সেখানেই ছিল চুনাগলি রোড (থ্যাকারের ডিরেক্টরিতে নাম লেখা চুনম গলি)। সে গলির নাম পরে পাল্টে হয় ফিয়ার লেন। তাছাড়া আছে চুনাপুকুর লেন। চুনারিটোলার একটু পুব দিকে, লেডি ডাফরিন হসপিটালের কাছে, কলেজ স্ট্রীট আর আমহার্স্ট স্ট্রীটের মাঝামাঝি জায়গায় বৌবাজার স্ট্রীট থেকে বেরিয়েছে সেই গলি। এইসব এলাকায় ছিল চুনুরিদের বাস, শামুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করত তারা। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সে শিল্পের বেশ বাড়বাড়ন্ত ছিল সে অঞ্চলে, এবং তার থেকেই গাঁয়ের নাম হয় কলিকাতা, লিখেছেন ভাষাচার্য।

সুনীতিবাবুর বক্তব্য খণ্ডনের চেষ্টা করতে গিয়ে বিপ্লবী রাধারমণ মিত্র তাঁর প্রবন্ধে চুন তৈরির কথা লিখেছেন। লিখেছেন, কলকাতার পাশে ধাপা বা লবণহ্রদে ও সুন্দরবনে বড় বড় শামুক ও ঝিনুক প্রচুর হয়। শুনেছি একসময়ে এই দুই জায়গার শামুক ও ঝিনুক পোড়া চুন কলকাতায় আমদানি হত। পূর্ব দিক থেকে আসত বলে এই চুনের প্রবেশদ্বার ছিল বেলেঘাটা। তাই বেলেঘাটা বহুকাল থেকেই চুনের আড়তের জন্য বিখ্যাত।

এই প্রসঙ্গে তারাপদ সাঁতরা লিখলেন, বেলেঘাটাতে এই সেদিনও, ১৯৫৬ সাল নাগাদ শামুকপোড়া চুন তৈরি হত। ওই সময়ে আমার (মানে তারাপদবাবুর) একবার বেলেঘাটায় Calcutta Improvement Trust নির্মিত বাসভবনগুলির কাছে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সে সময় এই ভবনগুলির কাছেই রাশিকৃত শামুক ও ঝিনুকের খোলা যেমন নজরে পড়েছিল, তেমনি চুন তৈরির জন্য শামুক পোড়ানো হচ্ছিল এও লক্ষ করেছিলাম। চুন তৈরির জন্য দেশীয় প্রথায় যেমন শুকনো কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করা হত, বেলেঘাটায় কাঠের বদলে কয়লার ব্যবহার হওয়ায় তার ধোঁয়া ও তৎসহ গন্ধ এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের যে কষ্টের কারণ হয়েছিল, তাও ওই সময় বাসিন্দাদের অনেকেই জানিয়েছিলেন।

রাধারমণবাবু এই চুন সংক্রান্ত তত্ত্বকে একেবারে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, তবে সুনীতিবাবুর লেখায় তাতে বিশেষ চুনা লাগেনি।

(ক্রমশ)

Comments