আরেকটা কলকাতা - ২ (Village Kolkata -
শঙ্কর চুনুরীকে পাওয়া গেল অগ্রগতি ক্লাবে ঢুকতে ঢুকতে। ক্লাব নয়, আসলে এনজিও। ওইটুকু গাঁ, তাতে এত্তবড় এনজিও। তারা ছোটদের ইস্কুল চালায়, প্রাইমারি টিচারদের ট্রেনিং দেয়, শহর থেকে যাওয়া কৌতূহলী সাংবাদিকদের পাত পেড়ে দুপুরে খাওয়ায়। আরও কী কী করে তার হিসেব আমার কাছে নেই। দামোদরের ঠিক পাড়টিতে তাদের দুখানা তিনতলা বাড়ি, দুই বাড়ির মাঝে বড় আঙ্গিনা, সেখানে ছোটবড় গাছের বাগান, নদীর ধার ঘেঁষে বাচ্চাদের খেলাধুলো করার একফালি জায়গা, সেখানে আছে দোলনা, সড়াৎ করে পিছলে নামার স্লিপ, বড় খাঁচায় একলা ময়ূর।
চুন এখন আর তৈরি হয় না। সে হত এককালে। সে আর বলার মত কী কথা? বছর পনের-কুড়ি আগে চুন তৈরির কাজে বাবাকে সাহায্য করেছি আমি। চুন পোড়ানোর ভাঁটি বানাতে হত, ইঁটের পাঁজা যেমন। প্রথমে ধরুন মাটির ওপরে এই অতটা জায়গা জুড়ে মোটা করে খড় পাতা হত। তার ওপর ঘুঁটে বিছনো হত। তার ওপর দেওয়া হত কয়লা। সেই কয়লার ওপর শামুকের খোলা দেওয়া হত। তার ওপর আবার কয়লা দেওয়া হত, তার ওপর আবার এক প্রস্থ শামুক। এমনি করে করে প্রায় এক মানুষ সমান উঁচু হয়ে যেত। তারপর, রাত্তির বেলা নিচের দিকে খড়ে আগুন দেওয়া হত। রাত্তিরে কেন? সে যা ধোঁয়া আর গন্ধ হত সে আর কি বলব। গন্ধে নাড়ি উলটে আসত। তাই দিনের বেলা ভাঁটিতে আগুন দেওয়ার নিয়ম ছিল না। রাত্তিরে খাওয়া দাওয়া সেরে ভাঁটি জ্বালিয়ে ঘুমুতে চলে যাওয়া হত। সকালের মধ্যে পোড়া শেষ। তারপর সবাই মিলে ছাই সরিয়ে কয়লা বেছে চুন বের করা হত। সেই চুন থেকে ময়লা চেলে পরিষ্কার করা হত। তারপর বিক্কিরি করা হত।
কিন্তু চুন তৈরি ছেড়ে দিলেন কেন? কেন ছাড়লাম? ও আর পোষায় না। খরচা অনেক। কয়লা-ঘুঁটের দাম বেড়েছে... তার চেয়ে অনেক সস্তায় বাজারে চুন পাওয়া যায় এখন। হ্যাঁ, কোয়ালিটি তত ভাল হয় না। তা ছাড়া আপনার ওই শামুক-ঝিনুকের খোলা যোগাড় করা, সে বড় নোংরা কাজ। একবার মনে আছে এক বাড়িতে শামুক কিনতে গেছি, একটা মেয়েলোক বলল নিবে, শামুক নিবে? আমরা বলি হ্যাঁ। দরদাম করছি, এদিকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মেয়েটা কাপড়টা একটু তুলে পেচ্ছাব করে দিল খোলাগুলোর ওপরে। তারপর আর তাতে হাত দিতে কারো ইচ্ছে করে? আমরা ফিরে চলে আসছি, তো জিগ্যেস করছে, কি হল নিবে না? আমরা বলি, আজ থাক, কাল নিয়ে যাব। শামুক রাখা হত বাড়ির সবচেয়ে নোংরা জায়গাতে। তার ওপর বাচ্ছা ছেলের গু-মুত থেকে শুরু করে ঘরের নোংরা সব ফেলা হত। বলে নোংরা জায়গাতেই রাখতে হয় শামুক। বড় নোংরা কাজ বাবু। ও আর করিনি তাই। এখন কি করেন তাহলে? কি আর করব? এই ভ্যান টানি, কি একটু চাষবাসের কাজ করি... এই করেই চালিয়ে নিতে হয়।
*******
কার্তিক মাসের মাঝামাঝি দুপুরের রোদ মিঠে নয়, কিন্তু চড়চড়ে ভাব কম। রোগাপাতলা দামোদরের ওপর দিয়ে হাওয়া ভেসে এলে তাতে হাল্কা ঠাণ্ডার আমেজ। শরীর জুড়োয়। সবজেটে জলের ওপর দিয়ে হাল্কা ডানার ঝাপটে বক উড়ে যায়। ডানার ওপরের দিকের পালকগুলো হাল্কা বাদামী, নিচের দিকের গুলো ধবধবে। সাদা ছায়া জলে ভেসে যায়, এপার থেকে ওপারে।
বড় আমগাছতলায় লাল সিমেণ্ট বাঁধিয়ে গোল বেদী করা হয়েছিল কোনো কালে। গাছ বড় হয়েছে, শিকড়বাকড় এদিক ওদিক নিজেদের রাস্তা খুঁজতে গিয়ে ফাটিয়ে দিয়েছে শক্ত সিমেণ্টের গাঁথনি। ইঞ্চিটাক মোটা ফাটলের মধ্যে দিয়ে ঘাসের মাথা উঁকি মারে। ঝিম-ধরা দুপুরে বেদীর ওপরে বসে আনমনে বিড়িতে টান দেন দেয়াশীবাবু। বেতাই বন্দরের খোঁজ নিতে গেলে ইঁটের টুকরো দিয়ে সিমেণ্টে দাগ টেনে বুঝিয়ে দেন কোথা দিয়ে পৌঁছতে হবে সেখানে। বলেন ব্যাতাই বন্দর। এখন তো আর বন্দরও নেই, ঘাটও নেই। পাকা বিরিজ হয়ে গেছে। একটা দুটো নৌকো দেখতে পাবেন হয়ত। লোকে নিজেদের দরকারে রাখে। আগে অধিকারীমশাইয়ের কাছে গল্প শুনেছি, হাটের দিন সন্ধেবেলা দু-চারটে থলে ভরে যেত পারানির খুচরো পয়সায়। গ্রাম থেকে লোক নিয়ে যেতে হত সেই পয়সার বস্তা মাথায় করে আনতে। এখন আর সেদিন নেই।
কয়েকশ বছর আগে নাকি বেশ বড়সড় বন্দর ছিল বেতাই। প্রচুর বড় নৌকো, ছোট নৌকো, ডিঙি-পিনিসে জমজম করত জায়গাটা। ব্যস্ত ব্যাপারীরা দৌড়োদৌড়ি করত ঘাট থেকে উঠে আসা পেছল পথ। কারও মাথায় হাঁড়ি, কারও ঝুড়ি, কেউ খালি-হাত। গ্রাম কলিকাতার পশ্চিমে রায়ঘাট। বেতাইয়ের ঘাটে ব্যবহৃত বড় বড় নৌকোর মালিক আর মাঝিদের অনেকেই ছিল কলিকাতার বাসিন্দা। কাছাকাছি আরও একখানি ছোট বন্দর ছিল -- থলিয়া। মাঝিরা নৌকো নিয়ে বেতাই কি থলিয়া যাওয়ার পথে রায়ঘাট হয়ে যেত। কিম্বা হয়ত রায়ঘাট থেকেই রওয়ানা হত তাদের নৌকো। এখনও কলকাতার বেশ কিছু বাড়িতে পুরোনো নৌকোর জিনিসপত্র দেখা যায়। রতিকান্ত মণ্ডলের ছেলে পবন বলে তাদের দু-দুখানা বাইশশো বাইশ নৌকো ছিল। বাইশশো বাইশ কিসের মাপ সে জিগ্যেস করোনা। জবাব নেই। নৌকোগুলিও নেই। তবে নৌকোর মোটা মোটা শিকলি আর নোঙর রয়ে গেছে। আজিত মাঝি বলে তার বাপ কানাইলাল ছিল নামকরা মাঝি। বড় বড় নৌকো তৈরিও করত। নৌকো তৈরির সে সব যন্ত্রপাতি নাকি এখনও আছে তাদের বাড়িতে।
********
রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে। শহরে বৌবাজার আছে বলে কি গাঁয়ে থাকতে নেই? পোড়ো নীলকুঠি আর চুনুরিপাড়া বাঁহাতে রেখে পশ্চিমমুখো একটু এগোও, ডানদিকে পড়বে কালীতলা। বিরাট মন্দির তৈরি হচ্ছে শ্যামাকালীর। কালীমূর্তিটি কিন্তু অর্বাচীন নন। অন্তত এক শতাব্দী তো বটেই, বেশিও হতে পারে বয়স। সাত ফুটখানেক উঁচু চমৎকার মূর্তি, নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। থলিয়া (বা থলে) গাঁয়ের ছুতোররা নাকি এই মূর্তি গড়েছিল। আর কিছু এখন কেউ বিশেষ জানে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিতে ধুলো জমবে না? কার সময় আছে একশ দুশ তিনশ বছরের হিসেব মাথায় নিয়ে বসে থাকার? দায় পড়েছে কারও? লোকে তাই ভুলে গেছে। দোষ কারও নয় গো মা। স্বখাতসলিলের নিচে পলি পড়েছে, তার নিচে ঢাকা আছে ইতিহাস।
পুণ্যক্ষেত্রে একখানি বাজার বসে। তার নাম কালীতলার বাজার। বছর কয়েক হল লোকে তার নাম দিয়েছে বৌবাজার। অগ্রগতির সম্পাদক তপন মণ্ডল বললেন, এই বাজারে অনেক মহিলারা আসেন কেনাবেচা করতে, সেইজন্যেই লোকের মুখে মুখে এই নাম চালু হয়েছে। টুনির ঘরেও সে ধন আছে।
যেমন ধর, গড়ডাঙ্গা। গাঁয়ের উত্তর দিকে। জঙ্গলে ঢাকা উঁচু ঢিপি মত জায়গা। তাকে নিয়ে গল্প কত। কেউ বলে এলাকার যে সব লোক নীল চাষ করতে রাজি হত না, তাদের জীয়ন্ত কি মরন্ত অবস্থায় পুঁতে ফেলা হত গড়ডাঙ্গার ঢিপিতে। পাঁচুগোপাল রায় অবশ্য ১৯৭০-৭১ সাল নাগাদ লিখেছিলেন: ১৯৫৪ সালের অনুসন্ধানে এ গ্রামে এক প্রাচীন ঢিপির কথা জানিতে পারি। এ ঢিপি গ্রামের লোকালয়ের বাহিরে মাঠের প্রান্তে অবস্থিত এবং জঙ্গলাকীর্ণ। মূল ঢিপি প্রায় এক বিঘা পরিমিত ভূমি হইবে। স্থানটিকে "গড়ডাঙ্গা' বলা হয়। মনে হয় পূর্বে এ ঢিপির বিস্তৃতি আরও অধিক ছিল। লোকে চাষের কাজে ইহার কিছুটা সমতল করিয়া লইয়াছে। প্রাচীন ব্যক্তিদিগের নিকট শুনিয়াছিলাম মৃতবৎসা স্ত্রীলোকদিগের দোষ প্রতিকারার্থে গ্রহাচার্যগণ ও তান্ত্রিকেরা এখানে নানাবিধ ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠান করিতেন। দু-একজন প্রাচীন ব্যক্তি নাকি এইরূপ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। তবে বর্তমানে এরূপ ক্রিয়াকর্ম কিছুই আর হয় না। এই স্থানে শিশুদিগের করোটি মাটির ভিতর হইতে পাওয়া গিয়াছে। এই পাঁচুবাবুর বক্তব্যটিই মনে হচ্ছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য। এই গড়ডাঙ্গার পাশেই বিশাল ফাঁকা জমি। সে জায়গাকে গড়ের মাঠ বলতেই ভালবাসে লোকে।
বাঁধের উত্তরদিকে খানিক পতিত জলা জমি আর জঙ্গল। ওই দেখুন আমাদের শ্মশান, নিমতলা, গোবিন্দ আঙ্গুল তুলে দেখায় সে দিকে। বিশাল এক বটগাছ চারদিকে ঝুরি নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের পাশে। ভারি শান্ত, নিরিবিলি। পাখির ডাক ছাড়া আর কিছু কানে আসে না। শান্তিতে এক ঘুম দেওয়ার মত জায়গা বটে।
আর আছে ধর্মতলা। এ নামটা অবশ্য পুরোনো। তবে ধর্মতলার গল্পে যাওয়ার আগে একটু পাঁচুবাবুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে। পাঁচুবাবু মানে পাঁচুগোপাল রায়। গেঁয়ো ইতিহাসের বিষয়ে ভদ্রলোকের বেশ উৎসাহ ছিল। এই কলকাতা-রসপুর এলাকারই মানুষ ছিলেন। দেখা হল না ওঁর সঙ্গে। কয়েক বছর হল ধরাধামের মায়া কাটিয়েছেন শুনলুম। পাঁচুবাবুর পূর্বপুরুষ ছিলেন রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্র। কলকাতার পাশের গাঁ রসপুরে ছিল তাঁর নিবাস। শিবায়ন কাব্য প্রণয়ন করে তিনি যারপরনাই খ্যাতি লাভ করেন। ইয়া মোটা সেই কাব্যগ্রন্থের অরিজিনালটি যদ্দূর জানি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে রক্ষিত আছে। গ্রন্থটি প্রকাশও করেছেন পরিষদ। রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্রের পুত্র ছিলেন জগন্নাথ রায়। বর্ধমানের মহারাজা কৃষ্ণরাম রায় জগন্নাথবাবুকে তাঁদের গৃহদেবতা শ্রী শ্রী রাধাকান্ত জীউর দেবোত্তর সম্পত্তির জন্য কিছু জমি দেন। তার দরুণ একটি সনন্দপত্রও দিয়েছিলেন মহারাজা। সে হল বাংলা ১০৯১ সালের কথা। মানে ইংরিজি ১৬৮৪। মানে জোব চার্নক সাহেব পাকাপাকিভাবে সুতানুটি কলকাতায় আসারও বছর চারেক আগে। কৃষ্ণরামের দলিলে কোন মৌজায় কত জমি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল তার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল।
রষপুর.... ২০
হাবধাড়া...১০
তালসহর..১০
দুর্ব্বচট....৩২
কলিকাতা..১০
কুমারিয়া...৩
-----------------
মোট ...৮৫
কোনো ইউনিট লেখা ছিল না অবশ্য। এই মূল দলিলটি পাঁচুবাবুর কাছে সযত্নে রক্ষিত ছিল বলে শুনেছি। কিন্তু তাঁর বংশধর যাঁরা এখন সেখানে থাকেন তাঁদের এসব বিষয়ে কোনো উৎসাহ নেই বলে শুনেছি।
আরও সব পুরোনো দলিলে এই কলিকাতা গ্রামের কথা আছে। পাঁচুবাবুর কাছে রক্ষিত আর একটি দলিলের অংশবিশেষ:
এতদার্থে লিখিয়া দিলাম ইতি শন ১১৬৯। ঊনশত্তর শাল ব তারিখ ১১ আশাঢ়।
ইসাদি
শ্রীরুদ্রেশ্বর দাষ মিত্র
সাং -- রষপুর
শ্রীপরমেশ্বর ঘোষ
সাং -- পাইকপাড়া
প: বালি
শ্রীনিলাম্বর দাষ মিত্র
সাং -- রমেপুরা
হাবিধাড়া
শ্রীপ্রভুরাম দাস বষু
সাং -- বজারপুর
শ্রীখুদিরাম দেয়াশী
সাং – কলিকাতা
******
পশ্চিমে যদি মুখ করে দাঁড়াও, তাহলে তোমার বাঁদিকে পড়বে নীলকুঠি, আর ডানদিকে সিপিএম-এর পার্টি অফিস। আমতা পূর্ব ৪ নং লোকাল কমিটির আঞ্চলিক কার্যালয়। কলিকাতা, রসপুর, আমতা। দোচালা টিনের ছাউনি ছোট্টখাট্ট অফিসঘর, সামনে একটুকখানি বারান্দা, লাল সিমেণ্টের মেঝে, দেয়ালেও লাল রং। দরজায় তালা।
পশ্চিম দিকে খানিক এগিয়ে পাহাড়ের মত উঁচু রাস্তার গা বেয়ে নেমে পড়তে হবে ডানদিকে। হোঁচট যদি খেয়েছ কি পা পিছলে যদি পড়েছ, হাঁটু তো ছড়ে যাবেই, পাৎলুনেরও দফারফা হয়ে যেতে পারে। নামতে হবে সাবধানে। তারপর সোজাসুজি সরু পথ ঢুকে গেছে গাঁয়ের ভেতরে। গলায় ঝোলানো ক্যামেরা দেখে অগ্রগতি ক্লাবে কাজ সেরে ফেরা মেয়েটি যদি প্রশ্ন করে, কোথায় যাওয়া হবে গো? কার ছবি তোলা হবে? গোবিন্দ জবাব দেবে, অগ্রগতির মেয়েদের ছবি তোলার জন্য তাদের বাড়ি যাওয়া হবে। কিন্তু বোকা বানাবে কাকে? শানানো গলায় সাথে সাথে জবাব আসবে, আর মিথ্য কথা বলতে হবেনে, অগ্রগতির মেয়েদের ছবি তোলার হলে তো অগ্রগতিতেই তোলা হতো। ধর্মতলায় যাওয়া হচ্ছে সেইটাই বলো না কেন?
সত্যি কথাই। ধর্মতলাতেই যাওয়া হচ্ছে তো। কবেকার পুরোনো ধর্মমন্দির, একবারের জন্য চোখে দেখার ইচ্ছা।
ধর্মঠাকুর লৌকিক দেবতা। এ অঞ্চলে বেশ প্রসার ছিল তাঁর এক সময়। সেই কবে, বাংলার ১১৯৩ সালে (মোটামুটি ১৭৮৫ খ্রীষ্টাব্দে), শহর কলকাতায় তখনও হেস্টিংস যুগ চলছে, তখনই পড়শী গাঁ কুমারিয়ায় ছকুরাম পণ্ডিতকে ধর্মঠাকুরের জন্য বাস্তু এবং জমি দান করা হয়েছিল। পুরোনো দলিলে লেখা আছে এসব। এমনই ভরসা ছিল ঠাকুরের ওপর যে দলিল-টলিলে মানুষের বদলে ধর্মঠাকুরকে সাক্ষী রাখা হত। কলকাতা গাঁয়ের জগমোহন খাঁর ১২৪৫ সালের দলিলের ওপর লেখা ছিল ইসাদঁ শ্রীশ্রীধর্ম্মদেবতা। রসপুর গাঁয়ে পাওয়া ১২৫১ সালের এক কর্জপত্রেও লেখা দেখা যায় ইশাদ শ্রীশ্রীঁ ধর্ম্মদেবতা। আর যে মন্দিরখানা দেখতে যাওয়া হচ্ছে, সেইটি তৈরি হয়েছিল বাংলা ১২০৪ সালে। আটচালা গড়নের ছোট মন্দিরটির দরজার বেশ কিছুটা ওপরে পুরোনো কালের বাংলা হরফে লেখা আছে সে কথা। সে লেখা পড়া একটু কঠিন, কিন্তু গবেষক তারাপদ সাঁতরা মশাই তার পাঠোদ্ধার করেছিলেন। মন্দির সংস্কারের চেষ্টায় মাটির ফলকের লেখা খানিক ঢাকা পড়ে গেছে যদিও, তবুও জানা থাকলে পড়া যায়:
শ্রীশ্রীঁ ধর্ম্মদেবতা মন্দির তৈয়ার হইল সন ১২০৪ সালে শ্রীগয়ারাম
দেয়াশি মন্দির দেন সাং কলিকাতা শ্রীয়ভয়চরণ মিস্ত্রি সাং থলে।
তার মানে এ হল অষ্টাদশ শতকের একেবারে শেষের দিকের ব্যাপার।
শিবায়ন কাব্যের কবি রামকৃষ্ণ কবিচন্দ্রের বংশধর পাঁচুগোপাল রায়ের কথা আগে লিখেছি না? ১৯৫৪ সাল নাগাদ সুকুমার সেন মশাই পাঁচুবাবুকে কলকাতা গ্রাম এবং সেখানকার ধর্মদেবতার বিষয়ে খোঁজখবর করে দেখতে বলেন। পাঁচুবাবু জানতে পারেন মন্দিরের উপরিভাগে সিংহমূর্তি এবং সংস্কৃত লিপিও ছিল। মন্দির সংস্কারের সময় তাহা নষ্ট হইয়া গিয়াছে।
মন্দিরের দরজার ঠিক ওপরে দুপাশে দুটি সিংহের ভগ্নাবশেষ কিন্তু এখনও আছে। তাদের গায়ে পঙ্খের প্রলেপও দেখা যায়।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি আগে, পাঁচুবাবু যখন এই মন্দির নিয়ে চর্চা করছিলেন সেই সময়ের কথা ধরা আছে তাঁর লেখায়:
ধর্মঠাকুরের মন্দিরের মধ্যে ধর্ম, শিব, শীতলা, লক্ষ্মীনারায়ণ ও সিংহবাহিনীও আছেন। ধাতুনির্মিত চতুর্ভুজা সিংহবাহিনীর মূর্তিটি অপহৃত হইয়া গিয়াছে, তৎস্থলে ঘট স্থাপন করিয়া পূজা হইতেছে। ধর্ম কূর্মাকৃতি, ধর্মের নিত্য পূজা হয়। চৈত্র-সংক্রান্তিতে গাজন ছাড়া ধর্মের অন্য কোনও উৎসব হয় না। মন্দির মধ্যে একটি নারায়ণ শিলাও আছে। এই শিলা প্রায় দুই ইঞ্চি পরিমিত চতুষ্কোণ প্রস্তরখণ্ড। ধর্মের পূজারী উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ এবং সেবাইতদিগের পদবি দেয়াশি। মনে হয় ডোম জাতীয় "পণ্ডিতেরাই' পূর্বে পূজাদি করিতেনকিন্তু উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণদিগের প্রভাবে তাঁহারা পূজার অধিকারে বঞ্চিত হইয়াছেন। পূজারী ব্রাহ্মণ ব্যতীত মন্দির মধ্যে কেহ প্রবেশ করিতে পান না। "বাসঘরী' অর্থাৎ যাহারা পূজার বাসন-কোশন পরিষ্কার করে তাহারা বাসনপত্রাদি পরিষ্কার করিয়া বাহিরে রাখিয়া দেয়, পূজারি ব্রাহ্মণ তাহা মন্দিরাভ্যন্তরে লইয়া যান।
এইসব পড়া ছিল বলে গোবিন্দকে ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করি, ঢোকা যাবে মন্দিরে? সে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন যাবে না? শুধু জুতোটা নিচে খুলে রেখে যান। দুপুরের রোদে মন্দির তখন তেতে টং। পায়ের তলায় মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে। এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দরজা খুলি। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে দেখি ভেতরে ঠান্ডা আঁধারে বিশ্রাম করছেন নারায়ণশিলা আর একখানা কি দুখানা ঘট। আর কূর্মাকৃতি ধর্মমূর্তি।
ধর্মঠাকুরের মন্দিরে দুটি দরজা। একটি পুবে, একটি উত্তরে। কারণ বুঝতে পারি না। পুবের দরজাটি ব্যবহার হয়, উত্তরেরটি বন্ধ থাকে, সেদিকের চাতালও ভেঙ্গেচুরে গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। প্রতিটি দরজার দুপাশে দ্বারপাল মূর্তি। পুবের দ্বারে বাঁদিকের মূর্তিটির কোনো চিহ্ন নেই, তিনকোনা খোঁদলটুকু শুধু চোখে পড়ে। পোড়ামাটির টালিতেও সাজানো হয়নি এ মন্দির। যদিও হাওড়া-হুগলী জেলায় চমৎকার টেরাকোটার কাজওয়ালা মন্দিরের অভাব নেই। তাদের বয়স অবশ্য আরও বেশ কয়েকশ বছর বেশি।
পুবের দরজা, অর্থাৎ প্রধান দরজার ডানদিকে যে দ্বারপাল, তার চেহারা দেখলে মহিলা বলে বোধ হয়। পীন পয়োধরা ইত্যাদি। কিন্তু কেশ তার আস্কন্ধলম্বিত। আরও অশ্চর্যের বিষয় হল, তার পরনে সাহেবি পোশাক। হাফ-হাতা ফ্রক প্যাটার্নের জামা এবং পাৎলুন। কোমরে কোমরবন্ধ, পায়ে জুতো। মুষ্টিবদ্ধ বাম হাত বুকের কাছে চেপে ধরা, ডান হাতে মুগুর জাতীয় কিছু একটা।
উত্তরের দরজা, যেখানে সংস্কারের কাজ কম হয়েছে, তার দুই দ্বারপালই তুলনায় অক্ষতদেহ। বামদিকের্টি নারীমূর্তি, ডানদিকেরটি পুরুষ। পুরুষটির চুল লালুপ্রসাদ কাটিং, কোমরে বেল্টের মত জড়িয়ে কিছু একটা বাঁধা আছে, কিন্তু বাকি শরীরে সুতোটি নাই। বাঁ হাত সোজা ঝোলানো, ডান হাত বুকের কাছে রাখা। মহিলাটির সিঁথি করা চুল, মণিবন্ধ এবং বাহুতে গহনা, ঊর্ধ্বাঙ্গে চোলি জাতীয় পোষকের আভাস, নিম্নাঙ্গ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত, পোষাক স্পষ্ট নয়। এদের কারও হাতেই অস্ত্রশস্ত্র কিছু দেখলাম না।
রোদে তাতা মন্দিরের চাতাল থেকে নেমে আসি। সামনে খানিক খোলা জায়গা। ছোট মাঠের মত। ন্যাড়া। সেখানেও নাকি বাজার বসে। তবে এখন তার কোনো চিহ্ন নেই। মাঝখানে কিছু ঘুঁটে শুকোতে দেওয়া আছে। গুটি দুই-তিন হলদে পলিথিনের বস্তা পড়ে আচে একধারে। খালি জায়গাটার অন্যদিকে, মন্দিরের ঠিক মুখোমুখি, টালি-ছাওয়া ছোট্ট ক্লাবঘর। কলিকাতা নেতাজী সংঘ। স্থাপিত ১৩৭৮। হলদে রং করা বাড়িটি, দরজা জানালার রং নীল। ক্লাবের বাঁদিকে আরেকটি ঘর। নতুন আলকাতরা-পালিশ টিনের চাল ঘরটির সামনের দিকে বিশাল দরজা, দুপাশে দুটি জানালা। কোনোটিতেই পাল্লা-টাল্লার বালাই নেই। ভেতরে একটি মোটর বাইক দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপচাপ। সামনে বসে লুঙ্গি পরা উদোম-গা একটি বয়স্ক মানুষ বাঁশ ছুলছে কাটারি দিয়ে। তাকে বিরক্ত না করে ফেরার পথ ধরি। খাড়াই বাঁধের গা বেয়ে উঠতে হাঁপ ধরে যায়।
অগ্রগতির তিনতলায় পৌঁছে দেখি মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খেতে বসেছেন সম্পাদক তপনবাবু। কিসের জানি মিটিং আছে, তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। বললেন, আমাদের ক্যাণ্টিনে দুটি মুখে দিয়ে যাবেন কিন্তু। মেনে নিই। খেতে খেতেই কলকাতা গাঁয়ের নানা গল্প বলেন তপনবাবু। কিছু পড়া, কিছু শোনা, আর কিছু ইয়ে, মানে মনে হয় মনগড়া। সে যাগ্গে। এইভাবেই তো ইতিহাস গড়ে ওঠে।
বলছিলেন, স্থানীয় এক বামপন্থী কবির উৎসাহে কিভাবে বছর তিরিশ আগে এই এনজিও-র বীজ বপন হয়েছিল। তখনকার গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী আড্ডার কথা বলছিলেন। মেদিনীপুর থেকে আসা এক কবির বিষয়ে এক চমৎকার গল্প বললেন। সে গল্পের সাথে এই টইয়ের বিষয়ের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই যদিও, তবুও সেইটে বলেই ইতি টানব ঠিক করেছি।
সে নাকি অনেক কাল আগের কথা। যাতায়াতের বেশ অসুবিধা। হাওড়া-আমতা মার্টিন ট্রেন চলত তখন। সে সব দিনেও নাকি আমতা-রসপুর-কলিকাতায় এক কবির সূত্রে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসতেন নানা কবি। আর কি তাদের সব কবিতা। ছিটে গুলির মত মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। বোঝা কঠিন। কিন্তু আধুনিক কবিতা ওরকম না হলে চলে না।
একজন কবি নাকি আসতেন মেদিনীপুর থেকে। প্রচুর কবিতা লিখতেন। চাকরি-বাকরিতে বিশ্বাস ছিল না। খিটখিটে বৌয়ের কাছে অশেষ গঞ্জনা সহ্য করতে হত। কিন্তু কবিতার জন্য সবই সহ্য করতে রাজি ছিলেন ভদ্রলোক। একদিন নাকি কোনো কবি সম্মেলনের জন্য বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন, এমন সময় ছলোছলো চোখে স্ত্রী বললেন কেমন ছাই কবি তুমি? শোবার ঘরের কোনায় বসে রান্না করতে হয় আমাকে, আমার জন্যে একটা রান্নাঘর পর্যন্ত করে দিতে পারলে না। নোংরা রুমাল দিয়ে স্ত্রীর চোখ মুছে কবি প্রতিজ্ঞা করলেন যে করেই হোক রান্নাঘর তিনি বানিয়ে দেবেনই। বৌকে বললেন, প্রয়োজন হলে নিজের হাতে একটা একটা করে ইঁট যোগাড় করে এনে তোমার রান্নাঘর আমি গড়ে দেব।
সেই কাল হল। তারপর থেকে যেখানেই পড়ে থাকা ইঁট দেখেন, তুলে নিয়ে কাঁধের লম্বা ঝোলায় পুরে ফেলেন কবি। বাড়ি নিয়ে জড় করে রাখেন। রান্নাঘর হবে। তো, একদিন রসপুর-কলিকাতায় সারারাত কাব্যচর্চা সেরে ভোর ভোর স্টেশনের দিকে রওয়ানা হলেন ভদ্রলোক। চারদিক কুয়াশায় মোড়া। চাদরে গা-মাথা মুড়িয়ে হনহন করে হাঁটছেন। স্টেশন চত্বরে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় নজর পড়ল পথের পাশে দুখানা ইঁট পড়ে আছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে টপ করে ইঁটদুখানা ঝোলায় পুরে ফেললেন। তারপর গুটি গুটি পায়ে প্লাটফর্মে গিয়ে ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। টিকিট-ফিকিট কাটা সেকালে বাধ্যতামূলক ছিল না।
শীতের ভোর। স্টেশনে মাত্র কয়েকটাই লোক। আর সময়টাও খারাপ। চারিদিকে বোমাবাজি, প্রায়ই গুলি চলার, লোক মরার খবর আসে এদিক ওদিক থেকে। পুলিশও বেশ সতর্ক। এখন হয়েছে কি, ওই ভোরেও জনা দুই সাদা পোষকের পুলিশের লোক স্টেশন চত্বরে নজরদারি করছিল। কবিকে দেখেই তাদের মনে সন্দেহের উদয় হয়েছে। উস্কোখুস্কো চুল, রাতজাগা চোখ, কাঁধে ঝোলা, আর তার মধ্যে রয়েছে বেশ ভারী কিছু জিনিস। দুই পুলিশ দুদিক থেকে আস্তে আস্তে এসে একেবারে জড়িয়ে ধরল কবিকে। কবি যত হাঁসফাঁস করেন, যতই বলেন, আরে ছাড়, ছাড়, আমাকে কেন ধরছ? আমি কবি, পুলিশের লোক তাঁর কথাই শোনে না। বলে, অনেক দেখা আছে ওরকম কবি। ঝোলায় করে বোমা নিয়ে ঘুরছে, আবার বলে আমি কবি! চল শালা থানায়, রুলের গুঁতো খেলে আসল কথা বেরোবে পেট থেকে। কবি বলেন, বোমা নয়, নয়, ওগুলো ইঁট। পুলিশ বিশ্বাস করে না। টেনে নিয়ে যায় থানায়। আরও পুলিশেরা আসে। খুব সাবধানে ভদ্রলোকের কাঁধ থেকে ঝোলা খুলে নেওয়া হয়। তারপর ঝোলার ভেতরে নজর করে পুলিশরা সব হাঁ। এই ভোরবেলা এরকম দুটো গাব্দা ইঁট ঝোলায় পুরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে লোকটা? অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে আসল কথাটা কবির পেট থেকে বের করা গেল। বৌকে রান্নাঘর গড়ে দেবেন কথা দিয়েছিলেন বলে এইভাবে ইঁট কুড়িয়ে বেড়াতে হয় ওঁকে। শুনে টুনে পুলিশের লোকগুলো বলল, যা: শালা পাগল। যা, দূর হ এখান থেকে।
সেদিনের ফার্স্ট ট্রেনটা মিস হয়ে গেল কবির। অবশেষে পরের ট্রেনটা ধরে বাড়ি পৌঁছতে হয়।
ভাত খেতে খেতে খুব গুছিয়ে গল্পটা বললেন অগ্রগতির সম্পাদক। তারপর বললেন, বললে বিশ্বাস করবেন না অচিন্ত্যদা, এই করে করে ইঁট যোগাড় করে শেষ পর্যন্ত বৌকে নিজের হাতে রান্নাঘরটা বানিয়ে দিয়েছিলেন সেই কবি।
হাঁ করে শুনি। বিশ্বাস করব কি করব না বুঝে উঠতে পারি না। হলেও হতে পারে। সত্যি যে কোথায় শেষ হয় আর কল্পনা যে কোথায় শুরু হয় সে কথা বোঝা ভারী মুশকিল।
(ইতি)
(গবেষক তারাপদ সাঁতরা মশাইয়ের লেখা কীর্তিবাস কলকাতা বইয়ের একটি অধ্যায়ের কিছু পরিচ্ছেদ এই লেখার কলেবর বৃদ্ধি করেছে এবং এটিকে পাঠকের পাতে দেওয়ার উপযুক্ত করতে সাহায্য করেছে।)







.jpg)

Comments
Post a Comment