চন্দ্রকেতুগড় (Chandraketugarh)


সবুজ দোকান, লাল বোর্ড

ঝেঁপে নেমেছে বৃষ্টি। নড়বড়ে তক্তার বেঞ্চে কোনোরকমে পশ্চাদ্দেশ ঠেকিয়ে বসে আছি। চা হবে তো ভাই? হবে। দুধ ছাড়া হবে না। তাই সই। দোকানের দেওয়াল বাঁশের খুঁটি দিয়ে তৈরি। তাই বলে মনে করবেন না যে ঘনসন্নিবদ্ধ বংশদণ্ড পরস্পরসন্নিহিত হয়ে দণ্ডায়মান এবং তার ওপরে মৃত্তিকার প্রলেপ। সেরকম কিছু আদৌ নয়। স্রেফ ফাঁক ফাঁক করে কয়খানা লম্বালম্বি করে চেরা বাঁশ পাশাপাশি মাটিতে পোঁতা, দুইখানি দণ্ডের মধ্যে ইঞ্চি ছয়েক করে গ্যাপ। হ্যাঁ, তার ওপরে মেলা রয়েছে অর্ধস্বচ্ছ বর্ণহীন পলিথিন। এই রকম দেওয়াল দোকানের তিন দিকে। সামনের দিক খোলা। এবং ডাইনে ও বাঁয়ের দেওয়ালে বাঁশের বেড়া শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে পলিথিন। আর খানিকটে সালোকসংশ্লেষের আশায় আমি একেবারে সামনের দিকে ঘেঁষে বসেছিলুম। ফলে পৃষ্ঠদেশে শ্রাবণের ধারাবর্ষণ। দোকানঘরের চালটিও তৈরি হয়েছে পলিথিন দিয়ে। তার রং কালো। সেখান থেকে জল পড়ছে চুঁইয়ে। নড়বড়ে টেবিলের ওপর অযত্নে রাখা ডিভিডি প্লেয়ারের ওপর জমা হচ্ছে জল।

দোকানটি দেখা গেল এক নালা অথবা নর্দমার ওপর অবস্থিত। নালার ওপর কয়েকখানা বাঁশ ও তক্তা পেতে তৈরি হয়েছে তার মেঝে। দুয়েকটা চটের থলিও পাতা এখানে ওখানে। কিন্তু তক্তাগুলির মধ্যেও খানিকটা করে ফাঁক। ফলে নিচে তাকালেই চোখে পড়ছে ঘোলাটে কালো জল। তারই একপাশে শিলনোড়া পেতে মশলা বাটছেন যে দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ তাঁকে দেখতে প্রায় আবোল তাবোল কাব্যগ্রন্থের কাঠবুড়োর মত। নেড়া মাথা, লম্বা দাড়ি। কাঠবুড়ো ছড়াও দোকানে আছেন এক মহিলা এবং একটি কমবয়সি ছেলে।

দোকানের সামনের দিকে একপাশে রাখা কয়লার উনুন থেকে নীলচে ধোঁয়া উঠছে, পুরোনো তালপাতার পাখা দিয়ে উনুনের নিচের মুখে হাওয়া করছে ছেলেটি, ঝরঝরে পাখা থেকে আওয়াজ উঠছে ফটফট চটপট। কালচে কেটলি গম্ভীর মুখে বসে আছে তপ্ত কয়লার ওপর।

উনুনের বাঁদিকে ছোট্ট একখানা কাচের শো-কেস। তার ভেতরে এক কোনায় পড়ে রয়েছে লোকাল কারখানায় তৈরি তিনখানি কোয়ার্টার পাউণ্ড পাউরুটি। অন্য তাকে রাশীকৃত সিগারেটের প্যাকেট। বেশিরভাগই পুরোনো, রং-জ্বলা এবং খালি।

আমি বসে আছি বাঁদিকের দেওয়াল ঘেঁষে পাতা তক্তায়। আমার মাথার পেছনে ঝুলছে লম্বাটে বোর্ড। তার ওপরে বড় বড় লাল অক্ষরে লেখা দোকানের নাম — সবুজ রেষ্টুরেণ্ট। তার নিচে ছোট করে লেখা মোবাইল নাম্বার, তার নিচে লেখা :

স্পেশাল খাবার পাওয়া যায়

তিনচুরিয়া অর্ডার দিলে পাওয়া যায়

প্যাকেট ২০ টাকা


তিনচুরিয়াটা কি বস্তু? জানা গেল সে হল রসমালাইয়ের মত এক জাতীয় মিষ্টি। কিন্তু আগে থেকে না জানালে পাওয়া যাবে না। পেট এদিকে চুঁই চুঁই করছে খিদেয়। খাবার কিছু কি পাওয়া যাবে এখন? ঘাড় ঘুরিয়ে বোর্ডের দিকে চোখ ফেরাই আবার। দেখি তিনচুরিয়ার নিচে বড় বড় করে লেখা রয়েছে রেড বোর্ড। সবুজ রেষ্টুরেণ্ট, তার রেড বোর্ড? চমকিত হই। সত্তরের ছেলেদের পকেটে পকেটে নাকি থাকত মাও-এর বাণীসমৃদ্ধ ছোট্ট রেডবুক। কিম্বা লুকোনো থাকত বইয়ের তাকের ফাঁকে, বড় বইপত্তরের আড়ালে। আর এরা এই সবুজ রেষ্টুরেণ্টে এত বড় একখানা রেড বোর্ড-ই ঝুলিয়ে রেখেছে। কাদের সঙ্গে কাদের সব অশুভ আঁতাতের কথা এই জন্যেই কি বলে থাকতেন বুদ্ধবাবুরা?


সে যাগ্গে, রেড বোর্ডে দেখলুম লেখা আছে কি কি পাওয়া যায় এই রেষ্টুরেণ্টে। চাউমিন (১৬ টাকা), চাউমিন হাফ (১০ টাকা), স্পেশাল চাউমিন (২০ টাকা), মোগলাই (১৫ টাকা), মোগলাই ডবল ডিম (২০ টাকা), এগরোল (১০ টাকা), এগরোল ডবল ডিম (১৫ টাকা), স্যানরুইস (৩ টাকা), ভেজিটেবিল (২ টাকা), ভেজ পোকরা (৩ টাকা), বনচপ (২ টাকা), চিকেন পোকরা (৫ টাকা), স্পেশাল প্যাটিস (৩ টাকা)।

কিন্তু এখন সে সব পাওয়া যাবে না জানা গেল। পরোটা আর ঘুগনী মিলতে পারে। পরোটা? উনুনের পাশে টোল-খাওয়া অ্যালুমিনিয়ামের পাত্তরের ওপর খান কয়েক বড় বড় ফোলা ফোলা লুচি রাখা আছে দেখছি যে। জানা গেল ওইগুলোই হল পরোটা। তো সেই গরম গরম পরোটা আর ঘুগনী মন্দ লাগল না খিদের মুখে। তারপর কটকটে গোলাপী রঙের প্লাস্টিকের জাগ থেকে ঢকঢক করে একপেট জল। কয়েক ঘণ্টার মত নিশ্চিন্দি।

বাইরে বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গেছে।


রূপকথা

এক ছিল রাজা। তার এক রাণী। দুধে-আলতায় রঙ সে রাণীর, হাসলে পরে মাণিক ঝরে, কাঁদলে ঝরে মোতি। রাজার হাতিশালে শত হাতি, ঘোড়াশালে হাজার ঘোড়া। বিরাট রাজধানী শহর — লোক লশকর সেপাই সান্ত্রী দোকান বাজারে ভরভরাট। কিন্তু মন ভাল নেই কারও। না রাজার, না মন্ত্রীর, না সেপাই-সান্ত্রীর। দলবল নিয়ে রাজ্য আক্রমণ করতে আসছে গোরাই পীর। আকাশ জুড়ে যুদ্ধের মেঘ। কে জানে কি হবে। রাজামশাই তৈরি হন লড়াইয়ে যাবেন বলে। তলোয়ারটি কোমরে গোঁজেন, রাজ সহিস সাজিয়ে দেয় সেরা ঘোড়া, বেরোনোর আগে দেবতাকে প্রণাম করে দেখা করতে আসেন রাণীর সঙ্গে। চিন্তায় ভাবনায় মুখে কথাটি নেই মহারাণী কমলার। শেষ শ্রাবণের ভরা দিঘীর মত টলটল করছে চোখ। রাজা বলেন যাই গো রাণী, যুদ্ধে যাই। রাণীর চোখে পলক পড়ে। পদ্মকলি চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে আসে মুক্তোর দানার মত দু ফোঁটা জল। ধরা গলায় বলেন, যাই বলতে নেই রাজা, বল আসি।

রাণীকে অভয় দেন রাজা। বলেন মক্কার পীরের সাধ্য কি আমাদের হারায়। কত বড় বড় বীরেরা আছে আমার সাথে। হামা আছে, দামা আছে, তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে জেতে এমন বাপের ব্যাটা কেউ আছে নাকি? এই দেখো, এই সাদা পায়রা নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে। আমি ফেরার আগেই রণখোলার মাঠ থেকে যুদ্ধজয়ের খবর নিয়ে এই পায়রা উড়ে আসবে তোমার কাছে। আর ওই কালো পায়রা? জিগ্যেস করেন রাণী। মুখ গম্ভীর হয় রাজার। ওকেও নিয়ে যাচ্ছি। এই পায়রা যদি ফিরে আসে রাণী, তাহলে কিন্তু আর দেরি কোরো না। প্রাণের চেয়ে সম্মান অনেক বড়। চোখের জল লুকোতে মুখ ঘুরিয়ে নেন রাজা। সিংহদুয়ারের সামনে গিয়ে চড়ে বসেন প্রিয় ঘোড়ার পিঠে।

টগবগ টগবগ আওয়াজ তুলে রাজার ঘোড়া ফটকের বাইরে চলে যায়। পেছন পেছন আরও কত শত সেপাই সান্ত্রী হাতি ঘোড়া। যুদ্ধ হবে রণখোলার মাঠে। প্রাসাদ থেকে খুব দূরে নয় সে মাঠ।

দিন নেই রাত নেই প্রচণ্ড যুদ্ধ চলে দু পক্ষের। পিছিয়ে যাওয়ার পাত্র নয় কেউই। তবে কিনা চন্দ্রকেতু হলেন রাজা। বড় বড় সব বীরেরা আছেন তাঁর সঙ্গে। বোঝা যায় কেউ ঠেকাতে পারবে না পীর গোরাচাঁদের হার। এমন সময় হঠাৎ খাঁচায় রাখা কালো পায়রাটা গেল উড়ে। কেউ বলে ঠিক করে বন্ধ করা হয়নি খাঁচার দরজা, কেউ বলে নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের চর এসে উড়িয়ে দিয়েছিল পায়রাটাকে। অলুক্ষুণে ব্যাপার কানে আসতে ভয় পেয়ে গেল সৈন্যরা। অজানা আতঙ্কে মনোবল ভেঙ্গে গেল তাদের। এক পা দু পা করে পিছু হটতে লাগল তারা।

পায়রা ওদিকে উড়তে উড়তে গিয়ে নামে রাণী কমলার কোলের ঠিক পাশটিতে। শিউরে উঠলেন রাণী। কাঁদতে কাঁদতে আছড়ে পড়লেন ভুঁইয়ের ওপর। তারপর মনে পড়ল যাওয়ার আগে কি বলে গিয়েছিলেন রাজা। দাসদাসীরা ঘিরে ছিল রাণীকে। ধীর গলায় তাদের বললেন একটা নৌকো ভাসা শানপুকুরে। নৌকো ভাসানো হল। সেই নৌকোয় গিয়ে উঠলেন রাণী কমলা। তারপর তাতে ছিদ্র করে দিলেন। রাণীকে নিয়ে নৌকো আস্তে আস্তে তলিয়ে গেল পুকুরের জলে।

রাজা তো জানতেন এমনটাই হবে। অমন যে দুর্জয় রাজা, তিনিও দুর্বল হয়ে পড়লেন। যুদ্ধে হেরে বন্দী হলেন পীর গোরাচাঁদের হাতে।

আরও এক কারণ নাকি ছিল চন্দ্রকেতুর পরাজয়ের পেছনে। হামা আর দামা দুই ভাই বিশাল শক্তিশালী। তারা ছিল রাজার প্রধান ভরসা। রাজার গড়ের লম্বা টানা দেওয়াল তো তাদের দুজনেরই তৈরি। সব্বাই চেনে তাদের। সব্বাই জানে —

লম্বা দেহ ভীষণ তাদের আকার

হামা দামা দুভাই মিলে বাঁধল বিরাট প্রাকার।

তাদের গায়ের জোর প্রচণ্ড। এক রাত্তিরে কোদালের আড়াই কোপে কেটে ফেলেছিল কয়েক বিঘার এক বিশাল পুকুর। নাম তার আড়াই কোপের পুকুর। কিন্তু এত শক্তি কোথা থেকে পেল তারা? সে ভারী গোপন কথা। বাড়িতে রান্নার পর আগ ভাতটা তারাই খেত। আগ ভাত হল হাঁড়ির ভাতের এক্কেবারে ওপরের অংশ। সেই খেয়েই তাদের গায়ে এত জোর। গোপন খবর হলে কি হবে, গোরাচাঁদ হলেন পীর। তিনি ঠিক যেনে ফেললেন দুই ভাইয়ের শক্তির রহস্য। একদিন তাদের মা সবে চুলা থেকে ভাত নামিয়েছে, এমন সময় ভিখারীর ছদ্মবেশে গোরাই এলেন তাদের বাড়ি। বললেন, কয়দিন কিছু খাওয়া হয় নাই, বড় খিদা লেগেছে মা, দুটি খেতে দিবি? মায়ের মন গলে গেল। কৌশলে সেদিনের আগ ভাত খেয়ে নিলেন পীর সাহেব। হামা দামা কাছে ছিল না তখন। কিন্তু যেই না পীর আগ ভাত খেয়ে নিয়েছেন, দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল দুই ভাই।

নিস্তেজ হইয়া পড়ে দুই ভাই দেহ

অসি না ধরিতে পারে কোনো ভাই কেহ।

কোনো রকমে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরল তারা। গোরাই ততক্ষণে সেখানে নেই, কিন্তু ব্যাপার দেখে হামা দামার কিছুই বুঝতে বাকি রইল না। প্রচণ্ড খেপে গেল তারা মায়ের ওপর। তার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল রাজার কাছে, বিচারের জন্যে। মায়েরও বিশাল দেহ, আর ছেলেরাও দুর্বল। টেনে আর নিয়ে যেতে পারে না। মাকে এক জায়গায় ফেলে রেখে খানিক হাঁপিয়ে নেয় তারা। বিশালবপু সেই মহিলার শরীরের চাপে ছোট একটা খালের মত নিচু জায়গা তৈরি হয়ে গেল সেখানটায়। নাম হল তার মাইজোল। পথে আস্তে আস্তে টানাটানিতে মায়ের কাঁকের হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। যেখানে সেই হাড় ভেঙ্গেছিল, সেই জায়গায় তৈরি হয়ে গেল কাঁকজোল নামের অগভীর খাল।

আর লড়তে পারল না হামা আর দামা। রাজাও মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। সে যাত্রায় তাই জয় হল পীর সাহেবের।

রাজাকে হারিয়ে পীরের মনে ভারি আনন্দ। কিন্তু কাজ তাঁর শেষ হয়নি তখনও। হামা দামা ছিল শক্তিশালী সৈন্য মাত্র। কিন্তু রাজার দুই প্রধান সেনাপতি আকানন্দ আর বাঁকানন্দ তখনও রয়ে গেছে অপরাজিত। হাতিয়াগড়ের অধিপতি মহিদানন্দের পুত্র তাঁরা। সহজ লোক নয় তারা —

নাম আমার আকানন্দ

বাঁকানন্দ আমার ভাই

পেয়েছি শিবের বর

রোজ করি মনুষ্য আহার।

এই আকা আর বাঁকাকে শায়েস্তা করতে গেলেন গোরাচাঁদ। এবারের লড়াই কিন্তু এত সহজ হল না। যুদ্ধ হল মরণপণ। পীরের তরবারির আঘাতে আকা আর বাঁকার ভবলীলা সাঙ্গ হল। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে প্রচণ্ড আহত অবস্থাতেই আকানন্দ শিবের দেওয়া অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলেন পীরকে —

আকানন্দ বাঁকানন্দ রাবণের শালা,

তার সঙ্গে যুদ্ধ হইল আড়াই পক্ষ বেলা।

কি জানি আল্লার মরজি নছিবের ফের

চেকোবাণে গোরাচাঁদের কাটা গেল ছের।

তবে অত সহজে কি আর গোরাচাঁদ মরেন? একটু পান, চুন আর সুরকী যোগাড় করে উঠতে পারলেই জুড়ে যেত তাঁর কেটে যাওয়া ছের। তাঁর দলবলকে বললেনও তিনি সে কথা —

ক্ষতস্থানে দাও পান চুন সুরকী লাগাইয়া,

এখনই দেখিবে সব আল্লারই দোয়া।

কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও যোগাড় করা গেল না সে সব। অবশেষে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন গোরাই পীর।

পীর মারা যাওয়ার পর বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেলেন রাজা। ফিরে এলেন প্রাসাদে। এসে দেখেন শূন্য পুরী হা হা করছে। বাঁচার ইচ্ছে চলে গেল তাঁর। যে শানপুকুরে রাণী কমলা নিজের নৌকো ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, মনের দু:খে সেখানেই ডুবে মরলেন চন্দ্রকেতু।


এই পদ্যগুলো সংগ্রহ করেছিলেন স্থানীয় প্রত্ন সংগ্রাহক দিলীপকুমার মৈতে। কিছু যোগাড় করেছিলেন গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে। পাঁচালী টাইপের কোনো ছাপা বই থেকে কিছু পেয়েছেন কিনা জিগ্যেস করাতে মনে করতে পারলেন না। দিলীপবাবু এখন আর নেই, তবে ওই পাঁচালী ধরণের বইয়ের খোঁজে আছি। দেখি যদি পাওয়া যায়। কলেজ স্ট্রীটে পাইনি। মেছুয়াতে বাজারের মধ্যে মুসলমানী বইয়ের খান তিনেক দোকান আছে, সেখানে খোঁজ করতে হবে। বাংলার পীর সাহিত্য বইটি কার লেখা মনে নেই। সেখানেও কিছু থাকলে থাকতে পারে।

এখানে পীর গোরাচাঁদের কথা একটু সংক্ষেপে বলে নিই। পীর গোরাচাঁদ বা গোরাই পীরের আসল নাম গাজী শাহ্‌ সৈয়দ আব্বাস আলি। মক্কা থেকে বাইশজন আউলিয়ার এক দল এ দেশে এসেছিল ধর্ম প্রচার করতে। আব্বাস আলি ছিলেন সেই বাইশ জনের একজন। গায়ের রং ফরসা ছিল বলে নাকি গোরাচাঁদ নাম পেয়েছিলেন। (তখনও গৌরচন্দ্রের আগমন ঘটেনি কিন্তু।) গোরাই গাজী, গোরাচাঁদ মুশকিল আসান, গোরা পীর — এইসব নামেও তিনি পরিচিত। গাজীর নামে গল্পের শেষ নেই। সে সব অন্য কোথাও বলব।

গোরাচাঁদের দরগা আছে বেড়াচাঁপায়, খনামিহিরেরে ঢিপির ঠিক পাশে। বেড়াচাঁপা থেকে কিলোমিটার দশেক দূরে বিদ্যাধরী নদীর তীরে হাড়োয়া। সেখানে আছে পীরের মাজার। ৭৬০ বঙ্গাব্দের ১২ই ফাল্গুন আকানন্দ বাঁকানন্দর হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন পীর। মাজারের সামনে প্রতি ১২ই ফাল্গুন এখনও তাই বসে পীর গোরাচাঁদের মেলা। ভাষাবিদ পণ্ডিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের বাবা মাফিজুদ্দিন আহ্‌মেদ ছিলেন গোরাচাঁদের সেবায়েত (সেবায়েত শব্দটি লক্ষ্যণীয়)।

বর্ধমান অঞ্চলেও পীর গোরাচাঁদের ভালই পসার ছিল মনে হয়।

গোরাচাঁদের দরগা আছে খাস কলকাতা শহরেও। পার্কসার্কাস অঞ্চলে গোরাচাঁদ দরগা রোড-কে এখন দরগা রোড বলেই জানে সবাই। কাছাকাছি অঞ্চলেই রয়েছে গোরাচাঁদ রোড এবং গোরাচাঁদ লেন। আমি কিন্তু খুঁজছি গোরাই গাজীর গান। কেউ পেলে জানাবেন।

(ক্রমশ)

Comments