মহুয়া (Country Liquor Mohua)
১
একটু পাহাড়-জঙ্গল মতো জায়গা হতে হবে, শীতের শুরুর দিকটায় হলে ভালো হয়, যখন দুপুর রোদে কুয়োতলায় বসে চান করতে শীত করবে না, কিন্তু বাংলোর কর্মচারী ছোকরা যেই দড়ি-বালতি-কপিকলে জল তুলে হুড়মুড় করে মাথায় ঢেলে দেবে, তখন ঠাণ্ডায় কাঁটা দিয়ে উঠবে গায়ে। খোলা জায়গা তো, সব সময় বাতাস দেয়।
বাংলো না ঠিক। লজ হলেই ভালো হয়। এককালে কোনো রাজা-জমিদারের বাড়ি ছিল হয়ত। গভর্নমেন্ট সেটা টেক ওভার করে সরকারি লজ বানাচ্ছে, এই রকম। কাজ শেষ হয়নি, ঘর দোর রেডি হয়নি সব, বিছানা-বালিশ সব জায়গা মত নেই, রানিং হট-অ্যান্ড-কোল্ড ওয়াটার নেই, বাথরুমে জল তুলে আনতে হয়, আর নয়তো কুয়োতলা।
পাঁচিল থাকবে না। মানে, ছিল হয়তো কোনও কালে, কিন্তু তার চিহ্ন দেখা যায় না। সেখানে ঝোপড়া গাছের বেড়া দেওয়া। একটা জং-ধরা লোহার দরজা থাকতে হবে, সে দরজা খোলার সময় ক্যাঁ-অ্যাঁ-চ করে আওয়াজ হবে একটু, আর আধ-ভাঙা ছিটকিনিটা মাটিতে ঘষে যাবে।
লজের সামনে দিয়ে পাকা রাস্তা থাকবে, ভারি ভারি ট্রাক যায় সে রাস্তা দিয়ে। রাস্তা বাঁদিক থেকে ডাইনে গিয়ে চড়াই উঠতে উঠতে জংলা পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে, এই রকম হতে হবে।
জায়গাটা হয়তো ময়ূরভঞ্জের রাজাদের এলাকা ছিল এককালে, সিমলিপাল জঙ্গলের রেঞ্জ ঢালু পিচরাস্তার গা বেয়ে গড়িয়ে নামতে নামতে শেষ হয়ে গেছে এখানে এসে। তারপর ধূ ধূ ফাঁকা মাঠ চতুর্দিকে। তার মধ্যে ছড়ানো-ছেটানো ঝোপ-জঙ্গল এখানে ওখানে।
ধরুন, এক শেষ-হেমন্তের বেলার দিকে জনা চারেকের ছোট্ট এক দল চলে গেছে এমনি একটা জায়গায়। তিনটে ছেলে আর একটা মেয়ে। চার জনেই কাঠ বেকার। সারা রাত্তির পুরী প্যাসেঞ্জারের আনরিজার্ভড কামরার কাঠের সিটে কোনও রকমে পশ্চাদ্দেশ ঠেকিয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করে, তারপর ছোট্ট এক গেঁয়ো ইস্টিশনে নেমে সেখান থেকে ছোটো লাইনের গাড়ি চড়ে শাল-মহুয়ার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টা চারেক ঢিকিস ঢিকিস করে মনে করুন তারা পৌঁছে গেছে সেই জায়গাটায়, যেখানে অনেক পথ খুঁজে, পৃথিবী শুয়েছে চোখ বুঁজে, এলিয়ে হৃদয়। ঠিক সেইখানেই সেই জমিদারবাড়ি, যেটাকে সারিয়ে-সুরিয়ে লজ তৈরি হচ্ছে এখন। সস্তায় থাকার চমৎকার ব্যবস্থা।
২
গুরুদত্ত গুড় লয়ে
প্রবৃত্তি মশালা দিয়ে
আমার জ্ঞানশুঁড়িতে চুয়ায় ভাঁটি
পান করে মোর মন মাতালে...
বেলা দশটা-এগারোটার সময় সেই লজে পৌঁছে, কাঁধের ঝোলাগুলিকে ধুপধাপ এদিক ওদিক ছুঁড়ে ফেলে তারপর চারজন করে কী? ভদ্দরলোকের মত তেল মেখে ছান-টান করে, ভাত খেয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা দেখে, নাকি চৌকিদারকে ডেকে মহুয়ার বোতলের খোঁজ করে?
নির্মিয়মাণ লজের চৌকিদার একজন মহিলা। এবং তার নাম জ্যাঠা। তিনি জানান, কোনওই সমস্যা হবে না মহুয়ার ব্যবস্থা করা। এই তো, লজের পেছনেই জঙ্গল, তার পর গাঁ। সেখান থেকে এনে দেওয়া যাবে। এক লিটারের বোতল সাড়ে তিন টাকা, পাঁচ লিটারের জেরিক্যান পনেরো টাকা। দামগুলো পষ্ট মনে আছে। (পরবর্তীকালে ঝাড়খন্ড-সংলগ্ন সুবর্ণরেখার পাড়ের এক গাঁয়ে এবং দান্তেওয়াড়ায় জঙ্গলের ভেতর খাস ভাটিখানায় বসে যথাক্রমে দেড় টাকা এবং পাঁচ টাকা গ্লাস মহুয়া খেয়েছি। মাঝে ম্যাকক্লাস্কিগঞ্জে পাঁচশ মিলিলিটারের লেবেল-মারা বোতল কিনেও খেয়েছি মহুয়া। আর একবার কাঁকড়াঝোর কি আমলাশোলে গাছতলা থেকে বিস্তর মহুয়ার ফল কুড়িয়ে চেখে দেখেছি। তবে সে সব গল্প অন্য কখনো করা যাবে।)
নাঃ, বোতল নয়, জেরিক্যান। জেরিক্যানই আনানো উচিত তো এই রকম পরিস্থিতিতে। তাই আনতে বলে দেওয়া হয়।
অনেকদিন আগের গল্প তো এ, কাজেই ঠিকঠাক কখন কী ঘটেছিল, মনে করে বলা ভারি কঠিন। এই যেমন, লজের কর্মচারী ছেলেটি যখন কুয়ো থেকে বালতি বালতি হিম-ঠাণ্ডা জল তুলে ঢেলে দিচ্ছিল গায়ে মাথায়, আর আমাদের দিল-জান-কলিজা সব তর্র্ হয়ে যাচ্ছিল, তার আগেই কি এসে গিয়েছিল মহুয়া? কুয়োতলায় গিয়ে বসার আগেই কি পাওয়া হয়ে গিয়েছিল তার তীব্র-মধুর স্বাদ? মনে পড়ে না। অত কিছু খুঁটিনাটি এতদিন পর কারই বা মনে থাকে। তবে স্নানের পর পান তো হয়েইছিল। সে কথা মনে আছে। তার পর থেকে এ যাবৎ দিশি বিলিতি বহু রকম সুধাপানের অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু মহুয়া রয়ে গেছে প্রথম প্রেমের স্মৃতি হয়ে। তার গন্ধটুকু নাকে এলে এখনও স্থান-কাল ভুলি। বিভোর লাগে।
পিপাসা মেটায় মহুয়া। খিদেও ভোলায়। লজে খাবার ব্যবস্থা নেই। সামান্য দূরে, রাস্তার ধারের ঝুপড়িতে বলে দিলে তারা রান্না করে দেয়। ভাত, ডাল, আলুভাজা, ডিমের ঝোল। তবে ঘণ্টা দেড়-দুই আগে জানাতে হয়। কিন্তু সময়ের হিসেব রাখে কে? কখন যেন এক বার গিয়ে খাবারের কথা বলে আসা হয়। বেলা কত হয়েছে কে জানে। ঝুপড়িতে রান্না চড়ে, আর লজের বারান্দায় চড়তে থাকে নেশা।
মাথার ভেতরে মদ গাঢ় হলে গলা বেয়ে গান নেমে আসে। ঝিমঝিম নেশা লাগে। মাথার ভেতরে পাক খেতে থাকে সুর। নাকি সুরা? তাই হবে।
৩
মন মাতালে মাতাল করে,
মদ মাতালে মাতাল বলে।
সুরাপান করিনে আমি
সুধা খাই জয় কালী বলে...
সন্ধ্যা হয়ে যায় কখন। পূর্ণিমার সন্ধ্যা। জোছনায় ধুয়ে যায় চরাচর। লজের গেট খুলে পিচের রাস্তায় নামতে যাই আমরা।
সন্ধের সময় বাইরে যাবেন না বাবু, হাতি নামে।
হাতি নামে মানে? এখানে কি হাতির শিলাবৃষ্টি হয়?
না বাবু, ওই পাহাড় থেকে নেমে আসে, বয়স্ক লোকটি কাঁচুমাচু মুখে হাসে। কাল সন্ধেবেলাতেও এসেছিল, ওই সামনেটায়। (কে লোকটা? জ্যাঠার পতিদেবতাই হবে নিশ্চয়ই। এর নাম কি তাহলে জ্যেঠি?)
পাত্তা দিই না। উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ি। পিচ রাস্তা বরবর আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকি পাহাড়ের দিকে। জোছনায় চমচম করছে চারদিক। চাঁদটাকেকে চোলাই করে মদ বানিয়ে কেউ যেন ঢেলে দিয়েছে বন-পাহাড়ের গায়ে।
সূর্য ডুবেছে বেশ খানিক ক্ষণ হল। পাথুরে মাটি ঠাণ্ডা হচ্ছে দ্রুত। বুনো গন্ধ উঠছে পথের দুপাশের গাছ-গাছলা থেকে। দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা ভারি ট্রাকের গোঁ গোঁ আওয়াজ আবছায়া এসে কানে লাগে। ঝিঁঝির ডাকে ঝমঝম করে বাংরিপোসির রাত্রি। শীত শীত লাগে। চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ি ঢালের মুখটায় এসে। এখান থেকে পাহাড়ে চড়েছে পথ।
সিমলিপালের অরণ্যের একটা কোনা ছুঁয়ে গেছে এ জায়গাকে। সামনের পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে জঙ্গল। সেদিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি খানিকক্ষণ। এই পাহাড়টুকু পেরিয়ে গেলেই কি ফুলকিয়া বইহার? মহুয়া-ভেজা মন আমার হুহু করে ওঠে। সেই নীরব নিশীথরাত্রে জ্যোৎস্নাভরা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হয় এক অজানা পরীরাজ্যে আসিয়া পড়িয়াছি -- মানুষের কোন নিয়ম এখানে খাটিবে না। এই সব জনহীন স্থান গভীর রাত্রে জ্যোৎস্নালোকে পরীদের বিচরণভূমিতে পরিণত হয়, আমি অনধিকার-প্রবেশ করিয়া ভাল করি নাই।
ফেরার পথ ধরি।
(এই লেখা বেশ কিছু বছর আগে 'এই সময়' দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিগুলি সব আমরাই তোলা। কোথায়, বলব না। )




.jpg)

Comments
Post a Comment